অনুসন্ধানী প্রতিবেদন,সাইফুল ইসলাম মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি
অবৈধ চুনা কারখানা বন্ধে প্রশাসনের অভিযানের রেশ কাটতে না কাটতেই গজারিয়া উপজেলার ভাটেরচরে নতুন রাস্তা সংলগ্ন নাল, জমিতে নতুন করে চুনা কারখানা নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রকাশ্যেই চলছে ‘পরিবেশ হত্যার’ এই আয়োজন। প্রশ্ন উঠেছে—প্রশাসন কি আবারও দূষণ শুরুর জন্য অপেক্ষা করবে?
সরেজমিনে যা পাওয়া গেল:
ভাটেরচর নতুন রাস্তার পূর্ব পাশে খোলা মাঠে বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘিরে ইটের তৈরি ৪টি চুল্লি নির্মাণ করা হয়েছে। চারপাশে ছড়িয়ে আছে ইটের ভাঙা টুকরা, চুনের কাঁচামাল ও নির্মাণ বর্জ্য। পেছনেই আবাসিক এলাকা ও শিল্প-কারখানা। সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্য—এই জমিটি কৃষি জমি হিসেবে রেকর্ডভুক্ত এবং কারখানার কোনো পরিবেশ ছাড়পত্র, ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স বা ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন নেই।
যে বিপর্যয় আসন্ন:
১. *জনস্বাস্থ্য হুমকি:* নতুন রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন স্কুল-কলেজের শত শত শিক্ষার্থী যাতায়াত করে। ৫০০ মিটারের মধ্যে ৩টি বসতবাড়ি ও একটি মসজিদ রয়েছে। চুন পোড়ানো শুরু হলে ক্ষারীয় ধুলা সরাসরি মানুষের ফুসফুসে ঢুকবে।
২. *কৃষিজমি ধ্বংসের পাঁয়তারা:* স্থানীয় কৃষকরা জানান, এই মাঠে তিন ফসলি ধান হতো। এখন চুল্লি তৈরির জন্য উপরিভাগের উর্বর মাটি কেটে ফেলা হয়েছে। কারখানা চালু হলে আশপাশের ৫০ বিঘা জমি চিরতরে চাষাবাদের অযোগ্য হয়ে পড়বে।
৩. *আইনের প্রকাশ্য লঙ্ঘন:* পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ অনুযায়ী আবাসিক ও কৃষি এলাকায় দূষণকারী শিল্প সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৩’ অনুযায়ীও এটি অবৈধ। তারপরও প্রশাসনের নাকের ডগায় নির্মাণকাজ চলছে।
স্থানীয়দের ক্ষোভ:
ভাটেরচর গ্রামের কৃষক মোতালেব হোসেন বলেন, “জুনাগড়ের কারখানা বন্ধ হইলো, এখন এরা এখানে আইসা শুরু করছে। প্রশাসন কি খালি ভাঙার জন্যই বসে আছে? শুরুর আগেই বন্ধ করেন। আমাদের মরার পর ক্ষতিপূরণ দিয়া কী হবে?”
স্কুল শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার বলে, “রাস্তা দিয়া হাঁটলেই এখন চুনের গন্ধ লাগে। চুল্লি জ্বললে তো স্কুলেই যাইতে পারব না।”
বিশেষজ্ঞের সতর্কবার্তা:
পরিবেশ অধিদপ্তরের মুন্সিগঞ্জ কার্যালয়ের সাবেক এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এটি একটি ‘প্রি-এম্পটিভ ক্রাইম’। দূষণ শুরু হওয়ার আগেই এটিকে গুঁড়িয়ে দেওয়া প্রশাসনের দায়িত্ব। একবার চুল্লিতে আগুন জ্বললে মাটি-পানি-বাতাসের যে ক্ষতি হবে, তা ২০ বছরেও পুষিয়ে নেওয়া যাবে না।”
প্রশাসনের কাছে ৫ দফা আলটিমেটাম:
‘বাংলাদেশ পরিবেশ পরিক্রমা মানবাধিকার সাংবাদিক সোসাইটি’ ও এলাকাবাসী যৌথভাবে প্রশাসনকে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছে:
১. অবিলম্বে নির্মাণাধীন চুল্লি ও অবকাঠামো বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।
২. জমির মালিক ও কারখানার উদ্যোক্তার বিরুদ্ধে পরিবেশ আইনে ফৌজদারি মামলা করতে হবে।
৩. কেটে ফেলা ফসলি জমি তাদের খরচে ভরাট করে চাষাবাদ উপযোগী করতে হবে।
৪. ভাটেরচর মৌজাকে ‘পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকা’ ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করতে হবে।
৫. দায়িত্বে অবহেলার জন্য স্থানীয় ভূমি অফিসের সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
হুঁশিয়ারি:
এলাকাবাসী ঘোষণা দিয়েছে, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নিলে তারা নিজেরাই চুল্লি ভেঙে দেবে এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করবে। “এবার আর জরিমানার নাটক চলবে না। স্থায়ী কবর চাই,” বলেন স্থানীয় ইউপি সদস্য।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মোবাইলে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, তারা অভিযোগ পেয়েছেন এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ছবি: ভাটেরচর নতুন রাস্তা সংলগ্ন নির্মাণাধীন অবৈধ চুনা কারখানা। প্রশাসন ব্যবস্থা না নিলে এখান থেকেই শুরু হবে আরেকটি ‘মৃত্যুকূপ’।


















